শ্রীঅরবিন্দের শিক্ষা

ইউটিউবে দেখুন (YouTube): https://youtu.be/cXtCazKPMT0

শ্রীঅরবিন্দের শিক্ষার প্রারম্ভ ভারতের প্রাচীন ঋষিদের জ্ঞান হতে, যাতে বলে যে জগতের বহির্ব্যাপ্ত রূপের পশ্চাতে রয়েছে এক পরম সত্তা ও চেতনার বাস্তবিকতা, যা  সমস্তকিছুর আত্মন, যে হল শাশ্বত এবং একমেবাদ্বিতীয়ম।  সকল সত্তা সেই একমেবাদ্বিতীয়ম আত্মন এবং পরমাত্মায় ঐক্যাত্ম কিন্তু চেতনার এক নির্দিষ্ট পৃথকত্বের দ্বারা বিভাজিত, যা বস্তুত হল  মনের, প্রাণের ও দেহের সত্যকার সত্তা ও বাস্তবতা সম্বন্ধে অজ্ঞানতা। এক নির্দিষ্ট মনোবৈজ্ঞানিক অনুশীলনের মাধ্যমে এই পৃথকত্বের চেতনার আবরণ সরিয়ে দেওয়া যায় এবং সচেতন হয়ে ওঠা যায় সত্যকার আত্মন সম্বন্ধে, যা হচ্ছে আমাদের সকলেরই ভিতরকার অন্তর্নিহিত দেবত্ব।

শ্রীঅরবিন্দের শিক্ষায় বলে এই একমেবাদ্বিতীয়ম সত্তা ও চেতনা এখানে বস্তুতেই নিহিত রয়েছে। বিবর্তনের দ্বারাই এর উন্মেষ ঘটে; চেতনা দেখা দেয় তার মধ্যে যা মনে হয়েছিল অচেতন, আর একবার প্রকাশিত হলে পরে তা স্ব-প্রণোদিতভাবে ক্রমশ উচ্চতর স্তরে বিকশিত হতে থাকে, আর একই সঙ্গে বৃহত্তর পূর্ণাঙ্গতার দিকে প্রসারিত হয়ে যায়। প্রাণ হল এই চেতনার মুক্তির প্রথম ধাপ; মন দ্বিতীয়। কিন্তু বিবর্তনের পরিসমাপ্তি মনেই নয়, এটির অপেক্ষা রয়েছে একটি বৃহত্তর মুক্তির জন্য— এমন এক চেতনার জন্য যা আধ্যাত্মিক ও অতিমানসিক। তাই বিবর্তনের পরবর্তী ধাপ হতে হবে অতিমানসের  বিকাশের দিকেই, যেখানে সচেতন  সত্তার প্রধান শক্তি হবে আত্মা। কারণ একমাত্র তখনই বস্তুতে অন্তর্নিহিত দেবত্ব নিজেকে সম্পূর্ণভাবে করবে মুক্ত এবং জীবনের পক্ষে পরিপূর্ণ প্রকাশ সম্ভব হবে।

কিন্তু পূর্ববর্তী বিকাশের ধাপগুলি যেখানে উদ্ভিদে ও প্রাণীতে অচেতনভাবে প্রকৃতির দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে মানুষের ক্ষেত্রে প্রকৃতি তার যন্ত্রের সচেতন সংকল্পশক্তি দ্বারা বিবর্তিত হতে সক্ষম। তবে সেটা শুধুমাত্র মানসিক সংকল্পের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে করা সম্ভব নয়, কারণ মন কোন এক নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই যেতে পারে আর তারপর তা চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। একটি রূপান্তরণ সংঘটিত করতে হবে — চেতনার এমন এক পরিবর্তন, যার মাধ্যমে মন রূপান্তরিত হবে উচ্চতর এক তত্ত্বে। এর পদ্ধতি পাওয়া যায় প্রাচীন মনোবৈজ্ঞানিক অনুশীলনে এবং যোগসাধনার ভিতরে। অতীতে এই প্রচেষ্টা করা হয়েছিল বিশ্ব থেকে সরে এসে আত্মন বা পরমাত্মার উচ্চতাতে বিলীন হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু শ্রীঅরবিন্দ বলেন এমন  একটি উচ্চতর তত্ত্বের অবতরণও সম্ভব, যা বিশ্বের ভিতর থেকে শুধু অধ্যাত্ম  আত্মনকে মোচনই করবে না, বরং বিশ্বের মধ্যে প্রকাশিত করে ধরবে তাকে, তখন মনের অজ্ঞানতা কিংবা এর সীমিত জ্ঞানের স্থানে আসবে এক অতিমানসিক ঋতচেতনা যা হয়ে উঠবে আন্তর সত্তার এক উপযুক্ত যন্ত্র,  যার দ্বারা মানব সত্তা আপনাকে বাহ্য সক্রিয়তা এবং আন্তর স্থিতি উভয় ক্ষেত্রেই  আবিষ্কার করতে পারবে, আর তার বর্তমান পশুত্বে ভরা মানবীয়তা থেকে এক দিব্যজাতিতে বিকশিত হয়ে উঠতে সক্ষম হবে। এই রূপান্তরের লক্ষ্য পূরণে যোগসাধনার মনোবৈজ্ঞানিক অনুশীলনের ব্যবহার করা যেতে পারে, যার সাহায্যে সংগুপ্ত অতিমানসিক চেতনার অবতরণ ও ক্রিয়ার দ্বারা সত্তার সমস্ত অংশকে পরিবর্তনে বা রূপান্তরের প্রতি তাকে উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

তবে এটি অবিলম্বে বা অল্প সময়ে অথবা কোনো দ্রুত কিংবা অলৌকিক এক রূপান্তরের মাধ্যমে সাধিত করা সম্ভব নয়। অতিমানসিক অবতরণ সম্ভবপর হয়ে ওঠার আগে অন্বেষককে অনেকগুলি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। মানুষ অধিকাংশত বাস করে তার উপরি মন, প্রাণ ও শরীরে, কিন্তু তার মধ্যে একটি আন্তর সত্তাও  রয়েছে, যার সম্ভাবনা বৃহত্তর, যার প্রতি তাকে জাগ্রত হয়ে উঠতে হবে — কারণ বর্তমানে সে এর থেকে অত্যন্ত সীমিত প্রভাবই লাভ করে থাকে এবং এটাই তাকে নিরন্তর চালিত করে থাকে মহত্তর সৌন্দর্য, সমন্বয়, শক্তিমত্তা ও জ্ঞানের নিত্য অন্বেষণে। তাই যোগের প্রথম প্রক্রিয়াই হচ্ছে এই আন্তর সত্তার বিভিন্ন স্তরের পরিসরকে খুলে ধরা এবং সেখান থেকে বাহ্যজীবনকে যাপন করা, যেখানে তার বাহ্যিক জীবন পরিচালিত হবে এক আন্তর আলোয় ও শক্তিতে। এর মাধ্যমে সে তার নিজের মধ্যে আবিষ্কার করবে তার প্রকৃত আত্মাকে, যা তার এই মানস, প্রাণিক ও শারীর উপাদানের বাহ্যিক মিশ্রণ নয়, বরং এগুলোর পশ্চাতে থাকা এক বাস্তবতা, ভগবত্তার একটি স্ফুলিঙ্গ। তাকে তার আত্মায় নিবাস করা শিখতে হবে এবং তার উদ্দীপনে নিজেকে শুদ্ধিকৃত  করে নিয়ে প্রকৃতির বাকি অংশগুলিকে অভিযোজিত করতে হবে সত্যের অভিমুখে। তারপরেই আসতে পারে ঊর্ধ্বমুখী এক উন্মীলন এবং সত্তার একটি উচ্চতর তত্ত্বের অবতরণ। কিন্তু তখনও সেটি সম্পূর্ণ অতিমানসিক আলোক ও শক্তিমত্তা হবে না। কারণ সাধারণ মানব মন এবং অতিমানস ঋতচেতনার মধ্যে রয়েছে চেতনা বহু স্তর। এই মধ্যবর্তী স্তরগুলিকে আগে উন্মীলিত করে, তাদের শক্তিকে নামিয়ে আনতে হবে মনে, প্রাণে ও শরীরে। একমাত্র তারপরেই ঋতচেতনার পূর্ণ শক্তি প্রকৃতিতে কাজ করতে পারে। সুতরাং এই আত্ম-অনুশীলন বা সাধনার প্রক্রিয়া হচ্ছে দীর্ঘ এবং কঠিন, কিন্তু এর সামান্যতম সাধনও হল অতীব লাভজনক, কারণ এটি পরম  মুক্তি এবং পূর্ণাঙ্গতাকে অধিকতর সম্ভব করে তোলে।

পুরাতন পন্থার অনেক কিছুই চলার পথে প্রয়োজনীয় — মনকে বৃহত্তর বিস্তৃতির দিকে এবং আত্মন ও অনন্তের অনুভূতির দিকে খুলে দেওয়া, যাকে বিশ্ব চেতনা বলা হয়, তার মধ্যে নিস্তরণ, কামনা ও আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি; বাহ্য তপস্যা যদিও অপরিহার্য নয়, কিন্তু কামনা ও আসক্তিকে জয় করা এবং শরীর ও তার চাহিদা, লোভ ও প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ হল অনিবার্য। পুরাতন ব্যবস্থার একটি সমাহার রয়েছে: বাস্তবিকতা আর আপাত দর্শনের মধ্যে মানস বিচারণের দ্বারা জ্ঞানলাভের পথ; ভক্তি, প্রেম ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে হৃদয়ের পথ, এবং কর্মের পথ, যা ইচ্ছাকে স্বার্থপর উদ্দেশ্য থেকে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার সেবা এবং সত্যের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। কারণ সমগ্র সত্তাকেই প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে যাতে যখন সেই বৃহত্তর আলো ও শক্তি প্রকৃতিতে কাজ করতে সক্ষম হবে তখন যেন এটি সাড়া  দিতে এবং রূপান্তরিত হতে পারে।

এই অনুশীলনে, গুরুর প্রেরণা এবং কঠিন পর্যায়ে তার নিয়ন্ত্রণ ও উপস্থিতি অপরিহার্য, কারণ তা নাহলে যেতে হবে বহু পদস্খলন ও ভ্রান্তির মধ্য দিয়ে, যা সাফল্যের সমস্ত সম্ভাবনাকে করবে ব্যাহত। গুরু হলেন এমন একজন যিনি উচ্চতর চেতনা ও সত্তায় উন্নীত হয়েছেন এবং প্রায়শই তার অভিব্যক্তি বা প্রতিভূ রূপে গণ্য হন। তিনি শুধু শিক্ষাদানের মাধ্যমেই নয়, বরং তার চেয়েও বেশি আপন প্রভাব ও দৃষ্টান্তের মাধ্যমে এবং তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতার দ্বারা সাহায্য করে থাকেন।

এটাই হল শ্রীঅরবিন্দের শিক্ষা ও অনুশীলনের পদ্ধতি। তাঁর উদ্দেশ্য কোনো একটি ধর্মের বিকাশ করা নয়, পুরাতন ধর্মগুলির একত্রীকরণও নয়, অথবা কোনো নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা নয় – কারণ এই সবই মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করবে। তাঁর যোগের একমাত্র লক্ষ্য হল এক আন্তর আত্মোন্নয়ন, যার মাধ্যমে প্রত্যেক অনুসরণকারী ক্রমে সমস্ত কিছুর মধ্যে সেই একই আত্মাকে আবিষ্কার করতে পারবে এবং মানসিক চেতনার চেয়ে উচ্চতর একটি চেতনার বিকাশ করতে পারবে, এক আধ্যাত্মিক ও অতিমানসিক চেতনা, যা করে তুলবে মানব প্রকৃতিকে রূপান্তরিত ও দিব্যায়িত ।

~ শ্রী অরবিন্দ

একজন শিষ্যকে লেখা চিঠি, ফেব্রুয়ারি ১৯৩৪

CWSA খণ্ড ৩৬, আত্মজীবনীমূলক টীকা, পৃষ্ঠা ৫৪৭–৫৫

অনুবাদ: শোভন, শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম

ইউটিউবে দেখুন (YouTube): https://youtu.be/cXtCazKPMT0